জীবনের চার অধ্যায়
-প্রসেনজিৎ দলুই
জীবনের চার অধ্যায়
শৈশব থেকে কৈশোর,
কৈশোর থেকে যৌবন,
যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্য,
আর শেষে মৃত্যুর নিঃশব্দ আহ্বান—
জীবন সত্যিই শুধু এই চার অধ্যায়ের
গল্প কী?
নাকি এর মাঝেই লুকিয়ে থাকে
হাজার মানুষের মুখ,
অগণিত অনুভূতি,
ভাঙা-গড়ার ইতিহাস,
আর সময়ের গভীর শিক্ষা ?
প্রথম অধ্যায় — শৈশব-
শৈশব মানেই বাবার শক্ত হাত,
মায়ের আঁচলে লুকিয়ে থাকা
নিশ্চিন্ত ভালোবাসা।
তার সঙ্গে দাদু-ঠাকুমা,
দিদা-দাদু, মাসি-পিসি, ভাই-বোন,
আর কত আপন মানুষ—
যারা বুকভরা স্নেহে আগলে রাখত
ছোট্ট প্রাণটাকে।
তখন পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট,
কিন্তু ভালোবাসায় ভরা ছিল
অসীম।
একটা ভাঙা খেলনাতেই আনন্দ ছিল,
একটা নতুন জামায় পূজোর খুশি,
পয়লা বৈশাখে নতুন স্বপ্ন,
দুর্গাপূজোর আলোয় হারিয়ে
যাওয়া সন্ধ্যা।
বৃষ্টির দিনে কাদামাটির গন্ধ,
ছাদের ওপর চাঁদ দেখা,
মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙা সকাল—
সবকিছুই যেন ছিল স্বর্গের মতো
সহজ।
তখন অভাব বুঝতাম না,
টাকার মূল্য জানতাম না,
মানুষের মুখোশ চিনতাম না।
শুধু জানতাম—
ঘরে ফিরলেই কেউ না কেউ অপেক্ষা
করে আছে।
কিন্তু সময় সব স্মৃতি ধরে
রাখে কী?
না কি ধীরে ধীরে
সবাই বড় হয়ে যায়,
আর শৈশব শুধু ছবির অ্যালবামে
আটকে থাকে?
দ্বিতীয় অধ্যায় — কৈশোর-
তারপর আসে কৈশোর—
স্কুলের মাঠ,
খাতার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন,
ছোট ছোট বন্ধুদের নিষ্পাপ হাসি।
মনে কোনো পাপ ছিল না,
ছিল শুধু সরলতা আর অগাধ বন্ধুত্ব।
টিফিন ভাগ করে খাওয়া,
শেষ বেঞ্চে গল্প করা,
পরীক্ষার আগের ভয়,
রেজাল্টের পর হাসি-কান্না—
সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর
পৃথিবী।
তখন প্রথম মন খারাপ হতো,
প্রথম কাউকে ভালো লাগত,
প্রথম নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে
ভাবতে শিখত মন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকেই নতুন করে চিনতে শুরু
করত মানুষ।
কেউ ডাক্তার হতে চাইত,
কেউ ইঞ্জিনিয়ার,
কেউ শিল্পী, কেউ কবি—
স্বপ্নগুলো তখন আকাশের মতো
বড় ছিল।
কিন্তু সেই কৈশোরও একদিন ফুরিয়ে
যায়।
বন্ধুরা আলাদা পথে হাঁটে,
কেউ দূরে চলে যায়,
কেউ স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে
যায়।
আজও কি মনে পড়ে সেই দিনগুলো?
নাকি জীবনের স্রোতে হারিয়ে
গেছে সব?
তৃতীয় অধ্যায় — যৌবন-
এরপর আসে যৌবন—
জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে
কঠিন অধ্যায়।
কিছু সুন্দর স্মৃতি তখনও পাশে
থাকে,
কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে
দাঁড়ায় দায়িত্ব।
বাঁচতে হলে লড়তে হয়,
সংসার গড়তে হয়,
পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নিতে
হয়।
সকালের ব্যস্ততা,
অফিসের ক্লান্তি,
অপূর্ণ চাহিদা,
অগণিত হিসেব—
সব মিলিয়ে জীবন তখন
এক কঠিন বাস্তবতার নাম।
তবুও মানুষ থেমে যায় না।
কারণ বুকের ভেতর তখনও
কিছু স্বপ্ন বেঁচে থাকে।
হাজার কষ্টের মাঝেও
মন কখনো খুঁজে ফেরে ভালোবাসা—
সেই যৌবনের গভীর, অদ্ভুত, মায়াভরা
ভালোবাসা।
কখনো সম্পর্ক ভাঙে,
কখনো প্রিয় মানুষ দূরে চলে
যায়,
কখনো নিজের মানুষরাই ভুল বোঝে।
তবুও মানুষ হাসে,
কারণ তার কাঁধে তখন
বাবা-মায়ের আশা,
সন্তানের ভবিষ্যৎ,
আর পরিবারের অসংখ্য নির্ভরতা।
যৌবন শেখায়—
সবাই পাশে থাকে না,
সব স্বপ্ন পূরণ হয় না,
তবুও পথ চলা থামানো যায় না।
চতুর্থ অধ্যায় — বার্ধক্য
তারপর ধীরে ধীরে আসে বার্ধক্য।
শরীরের শক্তি ফুরিয়ে যায়,
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়,
হাঁটার গতি ধীর হয়ে আসে।
কিন্তু মনের ভেতর জেগে ওঠে
ভক্তি আর স্মৃতি।
তখন খুব মনে পড়ে—
বাবা-মা, ভাই-বোন,
দাদু-দিদা, মাসি-পিসি,
শৈশবের সেই হারিয়ে যাওয়া
দিনগুলো।
যাদের সঙ্গে একদিন
হেসেছিলাম, কেঁদেছিলাম,
তাদের অনেকেই তখন আর পাশে থাকে
না।
কেউ সময়ের কাছে হেরে গেছে,
কেউ দূরত্বের দেয়ালে হারিয়ে
গেছে।
জীবনের পথ তখন শেখায়
কত ভুল ছিল, কত ঠিক ছিল,
কত মানুষ এসেছিল,
আবার কত মানুষ হারিয়েও গেছে।
বার্ধক্যে এসে মানুষ বুঝতে
শেখে—
অহংকারের কোনো মূল্য নেই,
টাকারও সীমা আছে,
শেষ পর্যন্ত রয়ে যায় শুধু
ভালোবাসা আর ব্যবহার।
আর তখনই চোখে পড়ে
ছোট ছোট কিছু শিশু—
যারা আজ খেলছে, হাসছে, স্বপ্ন
দেখছে।
কিন্তু তারাও একদিন
পেরিয়ে যাবে জীবনের সেই চার
অধ্যায়।
শেষ অধ্যায় — মৃত্যু
শেষে আসে মৃত্যু—
সব কোলাহল থেমে যায়,
সব দৌড় শেষ হয়ে যায়।
শুধু চোখের কোণে ভেসে ওঠে
অপূর্ণ কিছু স্বপ্ন,
কিছু না বলা কথা,
কিছু প্রিয় মুখ,
আর জীবনের সেই চার অধ্যায়ের
গল্প।
মানুষ তখন বুঝতে পারে—
জীবন খুব ছোট ছিল,
কিন্তু ভালোবাসাগুলো ছিল অসীম।
কেউ সঙ্গে করে টাকা নিয়ে যায়
না,
নিয়ে যায় না কোনো অহংকার,
শুধু রেখে যায় স্মৃতি,
কিছু কাজ,
আর কিছু মানুষের হৃদয়ে
নিজের অস্তিত্বের ছাপ।
জীবন আসলে এক চলমান কবিতা—
যেখানে শুরু আছে, শেষ আছে,
হাসি আছে, কান্না আছে,
পাওয়া আছে, হারানো আছে।
কিন্তু মাঝখানের ভালোবাসাগুলোই
মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
আর সেই ভালোবাসার মধ্যেই
মানুষ মৃত্যুর পরেও
অমর হয়ে থাকে।

Post a Comment